বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

একুশে বইমেলার আন্তর্জাতিকীকরণ

 

একুশে বইমেলার আন্তর্জাতিকীকরণ

- সাকিব জামাল
অমর একুশে বইমেলা বাংলাদেশি সাহিত্য ও সংস্কৃতিপ্রেমী জনগণের প্রাণের মেলা। প্রতিবছর বাংলা একাডেমির এই আয়োজন দেশের মানুষের মাঝে সৃজনশীল ও মননশীল চেতনা প্রস্ফুটিত করার জন্য যথেষ্ট আবেদনপূর্ণ একটি উদ্যোগ। দেশে দেশে বইমেলার আয়োজন হয় তবে বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যদেশের পার্থক্য হচ্ছে, পুরো এক মাসব্যাপী বইমেলা আর কোথাও হয় না। কেবল বাংলাদেশেই এতো দীর্ঘসময় বইমেলা হয় এবং ধারাবাহিকভাবে বেশ কয়েক দশক ধরে এত বড়সর বইমেলার আয়োজন চলছে ঠিকই কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সেই অর্থে এর আন্তর্জাতিকীকরণ ঘটেনি বললেই চলে। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা, লন্ডন বইমেলা, কায়রো বইমেলা এমনকি কলকাতা বইমেলার সাথে তুলনামূলক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বায়নের যুগে এটি অন্যতম একটি বড় ব্যর্থতা আমাদের!

দীর্ঘকাল ধরে চলা এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা কয়েক হাজার লেখক পেয়েছি, কয়েক লক্ষ বই পেয়েছি তবে তা শুধু আমাদের দেশের সাহিত্যমনা ব্যক্তিদের কাছে আত্মতুষ্টির বিষয় হয়ে আছে হয়তো। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই বইমেলার সার্থকতা কোথায়! প্রতিবছর  আমাদের এতবড় এবং মাসব্যাপী দীর্ঘ বইমেলা সম্পর্কে বিশ্বের কয়টা দেশ জানে? কয়টা আন্তর্জাতিক মানের বিদেশি মিডিয়া এই খবর কভারেজ দেয়? কতজন বিশ্বসেরা সাহিত্যিকর আগমন এখানে ঘটে? এসব প্রশ্নের উত্তর হতাশাব্যঞ্জক। অথচ এতদিনে দরকার ছিল বিশ্বের সমস্ত প্রান্তরের সাহিত্যিক ও পাঠকের কাছে এই বইমেলার প্রচার ও প্রসার নিশ্চিত করা।

সময় অবশ্য ফুরিয়ে যায়নি! বইমেলার আন্তর্জাতিকীকরণের এই দায়িত্ব মূলত বাংলা একাডেমিকে নিতে হবে। বইমেলায় আন্তর্জাতিক কর্নার স্থাপন করতে হবে। সেখানে বিদেশি প্রকাশকদের জন্য স্টল বরাদ্দ দিতে হবে, ঐ সমস্ত প্রকাশকদের জন্য যারা বাংলা সাহিত্যকে ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করবেন। আমাদের সাহিত্যকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে দেশি-বিদেশি অনুবাদকদের ফেলোশীপ প্রদান করার বিষয়টিও গুরুত্ব দেয়া উচিত। এছাড়াও বাংলা একাডেমি অনুবাদ ক্যাটাগরিতে পদক প্রদানের ক্ষেত্রে যারা বাংলা সাহিত্য অন্যভাষায় রূপান্তর করবে তাদেরকে বিবেচনা করতে হবে। অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। ভিনদেশি সাহিত্যকে বাংলায় অনুবাদের চেয়ে বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিকীকরণের জন্য আমাদের সাহিত্যকে অন্যান্য ভাষায় ভাষান্তর করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এসব কর্মকান্ডকে উৎসাহিত করার প্রভাবক হিসেবে বাংলা একাডেমির দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে, যেমন বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত উত্তরাধিকার পত্রিকাটি ইংরেজি ভার্সনেও প্রকাশ করা যেতে পারে। এছাড়া বিদেশি লেখক, পাঠক এবং গবেষকদের বইমেলায় সহজে আগমনের জন্য সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো এবং অনএড়াইবল ভিসাসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যাহোক, বাংলা একাডেমিকে অনেক কাজ দেয়া হলো। অবশ্য বইমেলার আন্তর্জাতিকীকরণের দায়িত্ব লেখক ও প্রকাশকদের ক্ষেত্রেও অনেক। প্রকাশক ও লেখকদের প্রকাশনা ও সাহিত্যকর্ম প্রকাশ ও উপস্থাপন এখন আর শুধুই বাংলা মাধ্যমে নয় বরং বহুভাষিক করা উচিত। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলা সাহিত্যের পাঠক বৃদ্ধিসহ গবেষণা ও প্রসারের দিকে দৃষ্টিপাত করা উচিত সবার।

সর্বপরি মুক্তপ্রযুক্তির এই যুগে একুশে বইমেলার আন্তর্জাতিকীকরণ এতোটাই জরুরি যে এটি করতে ব্যর্থ হলে বাংলা সাহিত্যের বিশ্বজয়তো দূরের কথা বরং আগামীর পৃথিবীতে এর আবেদন কমে যাবে আরও। এমনকি বিভিন্ন ধরণের কালচারাল হেজিমনির কাছে আমাদের সাহিত্যের পরাস্ত হবার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে! সুতরাং বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনা সকল মানুষের উচিত হবে অমর একুশে বইমেলার আন্তর্জাতিকীকরণ কার্যক্রমে যথাযথ ভূমিকা পালন করা যাতেকরে বিশ্বের দরবারে বাংলা সাহিত্যের একটা শক্তিমান অবস্থান তৈরি হয়।

উহ্! বৃষ্টি

 

উহ্! বৃষ্টি

- সাকিব জামাল
বৃষ্টির দিনে বিরহ জখম নীল ঘাসফুল হয়ে ফোটে!
আরও আরও বেদনার বৈঠকে ভাব জমে
মেঘে মেঘে । প্রেমের ছলে, সংঘাতে
যে আলো জ্বলে, আকাশে-হৃদয়ে,
পুড়ে যাই একা একা ভীষণ
ফেলা আসা দিনগুলোর
পৌনঃপুনিক ছোবলে;
বিষন্ন সন্ধ্যাকালে
কেউ চেনে না
আমারে!
প্রেম?
উহ্!

লিপস্টিকঃ লা মিওর

 লিপস্টিকঃ লা মিওর

- সাকিব জামাল


মলিন ঠোঁট! রাঙাতে চেয়েছিলাম

লাল গোলাপে, এক সাঁঝে।

মিহি সাউন্ড। স্পিরিচুয়াল হাসি;

"জোহরার লিপস্টিক লাগে?

দাও, দেখি!"

রঙে, ঠোঁট দুটো তার সাজলো যখন

পৃথিবীর সমস্ত শরীর কেঁপে কেঁপে ওঠে।

চোখ ঝাপসা হয়ে আসে আমার,

ভেসে যাই শ্রাবণের জলে।

অথচ পূর্ণিমার ক্ষণ, উপসংহারে

মাতাল কর্পোরেটাচ্ছন্ন অন্য ভোরে!

"জোহরার লিপস্টিক লাগে?"

হুমম... লা মিওর!

বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬

কেন করো বাহাদুরি?

 ঘুম ভাঙলে সকাল 

না ভাঙলে পরকাল 

কেন করো বাহাদুরি?

ও মন আমার, 

কেন করো বাহাদুরি?


দম ফুরাইলে জনম শেষে

দুই দিন আহাজারি । 

ও মন আমার, 

কেন করো বাহাদুরি?


সময় থাকতে হিসাব করো

পাপ পূণ্য কোনটা বড়?

ভালো কাজে মন বসাও 

খারাপ কর্ম দাও ছাড়ি । 

ও মন আমার, 

কেন করো বাহাদুরি?


ঘুম ভাঙলে সকাল 

না ভাঙলে পরকাল 

কেন করো বাহাদুরি?

ও মন আমার, 

কেন করো বাহাদুরি?


পরকালের কামাই করো

সকাল যদি পাও,

বৈঠা ধরে সঠিক ভাবে 

জীবনের নৌকা বাও । 

সাকিব জামাল কয়, আহা রে

মানুষ হওয়া আসল কারবারি!

ও মন আমার, 

কেন করো বাহাদুরি?


ঘুম ভাঙলে সকাল 

না ভাঙলে পরকাল 

কেন করো বাহাদুরি?

ও মন আমার, 

কেন করো বাহাদুরি?


ও মন আমার,

কেন করো বাহাদুরি?

মান্নান সৈয়দঃ পরাবাস্তবতার পথিকৃত

 

মান্নান সৈয়দঃ পরাবাস্তবতার পথিকৃত 

- সাকিব জামাল
উত্তরাধুনিক বাংলা সাহিত্যে বাঁক বদলের কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ বাংলা কবিতার প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে এসে পরাবাস্তবতার পথিকৃত হিসেবে  আত্মপ্রকাশ করেছেন একজন দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী সফল কবিরূপে। বিষ্ণু দে, জীবনানন্দ দাশ এর পরে বাংলা কবিতায় পরাবস্তবতার অন্যতম প্রবাদপুরুষ আব্দুল মান্নান সৈয়দই মূলত বিস্তর পরিসরে এই ধারাটি জনপ্রিয় করণের চেষ্টা করেছেন নিরলসভাবে, যা শুধু সমকালীন সাহিত্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের দৃষ্টি আকর্ষণ করেনি বরং আজও প্রাসঙ্গিক আলোচ্য বিষয় হিসেবে প্রণিধানযোগ্য। পরাবাস্তব কবিতার মূল ধারণা হলো অবচেতনমনের চিন্তা ভাবনাকে অপ্রচলিত ও আশ্চর্যকর কিন্তু নান্দনিক চিত্রকল্প দ্বারা প্রকাশ করা, যার সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়েছেন আব্দুল মান্নান সৈয়দ।

শিল্প সাহিত্যে যাঁরা পরাবাস্তববাদ চর্চা করে থাকেন তাদের মতে, "প্রকৃত সত্য কেবলমাত্র অবচেতনেই বিরাজ করে।" তাই পরাবাস্তববাদী শিল্পী বা সাহিত্যিকদের লক্ষ্য হল বিভিন্ন কৌশল ও আঙ্গিকে মনের গভীর থেকে সেই সত্যকে তুলে আনা। আব্দুল মান্নান সৈয়দ ঠিক এ কাজটিই করেছেন। প্রসঙ্গত, জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ থেকে কিছু উদ্ধৃতি দেয়া যাকঃ
“জ্যোৎস্না কী? – না, জ্যোৎস্না হয় জল্লাদের ডিমের মতো চুলহীন জলবায়ুহীন মুণ্ডু, জোড়া-জোড়া চোখ, সাতটি আঙুলের একমুষ্টি হাত, রক্তকরবীর অন্ধকার, এবং একগুচ্ছ ভুল শিয়ালের সদ্যোমৃত যুবতীকে ঘিরে জ্বলজ্বলে চিৎকার।”
(জ্যোৎস্না, জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ)
"কী চড়া বাজার! আমাদের পাশের লোকটির সত্যি-সত্যি গলা কেটে নিল
    চীনে প্লেটের উপর এক গাঢ় দোকানদার। এরকম প্রমাণ আমি কখনো
    দেখিনি। তারপর করল কি? -না, তার কাটা-মুণ্ডু ঝুলিয়ে দিল দোকানের
    উইণ্ডোর নিচে বিজ্ঞাপনে টপাটপ।"
(সমস্ত ভাসান দিলাম সমস্ত উড়াল, জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ)
এভাবে মনের গহীন থেকে ভাসিয়ে আনা আশ্চর্যকর এবং অসাধারণ সব চিত্রকল্পে সাজানো জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ, যা পরাবস্তবতার এক নতুন দিগন্ত হিসেবে বাংলা সাহিত্যে চিহ্নিত হয়ে আছে।

বর্তমানকালের বাংলা কবিতায় প্রায় সব কবিই কমবেশি পরাবাস্তবতার প্রয়োগ করেছেন। তবে নিকট বর্তমানে পরাবাস্তবতার সার্থক প্রয়োগ ঘটিয়ে বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন আব্দুল মান্নান সৈয়দ। তিনি বলতেন- "পরাবস্তবতাই হলো প্রকৃত বাস্তবতা।" এই ভাবনা থেকেই কবিতায় তিনি এনেছেন পরাবাস্তববাদী অনন্য বৈভব। যেমনঃ কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট  লিমিটেড এর 'আলোক সরকার আর অন্ধকার রায়' কবিতাংশ-
" ‘একি, আপনি বাজারে? কবিশাহেব, আপনিও কি বাজার করেন?’
--হ্যাঁ, আমাকেও বাজার করতে হয়,
আমাকেও তেল-নুন-মাংসের হিশেব কষতে হয়--
আমি নই বায়ুভুক রবীন্দ্রনাথ।"
অথবা একই কাব্যগ্রেন্থর 'কবিতা কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড' কবিতায় বলা হয়েছে-
"এখানে কবিতা বানানো হয়।
সব ধরণের কবিতা।
রাজনীতিক কবিতা, সামাজিক কবিতা।"
পরাবাস্তব চিত্রকল্পে কী কঠিন বাস্তবতার উদাহরণ। এরূপ জীবনমুখী অনেক বাস্তব কবিতার নির্যাস তিনি বাংলা সাহিত্যে উপহার দিয়েছেন পরাবাস্তবতার  আড়ালে, যা তাঁকে পরাবাস্তবতার পথিকৃত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে নির্দ্বিধায়।
এছাড়া, পরাবাস্তব কবিতার অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো বাস্তবতার সাথে স্বপ্নের একটি মেলবন্ধন। তাই পরাবাস্তববাদ চর্চাকারীগণ একটি বিশেষ পরাবাস্তববাদ তৈরির মূল লক্ষ্য হলো- সাধারণ দৈনন্দিন বাস্তবতা এবং স্বপ্নের সংমিশ্রণের সমন্বয় ঘটানো। মান্নান সৈয়দ এর কবিতায় আমরা এটিও পেয়েছি দারুণ ও সার্থকভাবে। উদাহরণ হিসেবে তার অনেক কবিতাই উদ্ধৃত করা যায়। যেমন একটি কবিতাংশঃ
"বাতাসে পোতা আছে আমার স্বপ্নের এন্টেনা
কারফ্যু শাসিত চার দেয়ালের মধ্যে বন্দী হ’য়ে আমি আছি
কিন্তু আমার আত্মা হ’য়ে পাখি উড়ছে ঐ
তার ছোট পাতলা ঠোঁটে রাজদণ্ডের মতো ধ’রে আছে।"
(আমার স্বপ্নের এনটেনা, ও সংবেদন ও জলতরঙ্গ)

পরিশেষে বলা যায়, আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বর্তমান ভাবধারার উল্লেখযোগ্য শাখাসমূহের অন্যতম একটি হলো পরাবাস্তববাদ। যা উপেক্ষা করা সম্ভব নয়, যদিও দৃষ্টান্তবাদীরা বা চৈতন্যবাদীরা পরাবাস্তববাদের তীব্র সমালোচনা করে থাকেন। যাহোক, আব্দুল মান্নান সৈয়দ আধুনিক কবিতার অন্যতম গবেষক, চর্চাকারী যিনি কবিতাকে নানানভাবে অস্ত্রপাচার করে পরাবাস্তবতার রঙে রাঙিয়েছেন। যা তাঁকে স্বতন্ত্র মহিমায় উদ্ভাসিত করে আজও পরাবাস্তবতার পথিকৃত হিসেবে বাংলা সাহিত্যে অনন্য উচ্চতায় অক্ষুণ্ণ রেখেছে।