একুশে বইমেলার আন্তর্জাতিকীকরণ
দীর্ঘকাল ধরে চলা এই আয়োজনের মাধ্যমে আমরা কয়েক হাজার লেখক পেয়েছি, কয়েক লক্ষ বই পেয়েছি তবে তা শুধু আমাদের দেশের সাহিত্যমনা ব্যক্তিদের কাছে আত্মতুষ্টির বিষয় হয়ে আছে হয়তো। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই বইমেলার সার্থকতা কোথায়! প্রতিবছর আমাদের এতবড় এবং মাসব্যাপী দীর্ঘ বইমেলা সম্পর্কে বিশ্বের কয়টা দেশ জানে? কয়টা আন্তর্জাতিক মানের বিদেশি মিডিয়া এই খবর কভারেজ দেয়? কতজন বিশ্বসেরা সাহিত্যিকর আগমন এখানে ঘটে? এসব প্রশ্নের উত্তর হতাশাব্যঞ্জক। অথচ এতদিনে দরকার ছিল বিশ্বের সমস্ত প্রান্তরের সাহিত্যিক ও পাঠকের কাছে এই বইমেলার প্রচার ও প্রসার নিশ্চিত করা।
সময় অবশ্য ফুরিয়ে যায়নি! বইমেলার আন্তর্জাতিকীকরণের এই দায়িত্ব মূলত বাংলা একাডেমিকে নিতে হবে। বইমেলায় আন্তর্জাতিক কর্নার স্থাপন করতে হবে। সেখানে বিদেশি প্রকাশকদের জন্য স্টল বরাদ্দ দিতে হবে, ঐ সমস্ত প্রকাশকদের জন্য যারা বাংলা সাহিত্যকে ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করবেন। আমাদের সাহিত্যকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে দেশি-বিদেশি অনুবাদকদের ফেলোশীপ প্রদান করার বিষয়টিও গুরুত্ব দেয়া উচিত। এছাড়াও বাংলা একাডেমি অনুবাদ ক্যাটাগরিতে পদক প্রদানের ক্ষেত্রে যারা বাংলা সাহিত্য অন্যভাষায় রূপান্তর করবে তাদেরকে বিবেচনা করতে হবে। অনুবাদ সাহিত্যের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। ভিনদেশি সাহিত্যকে বাংলায় অনুবাদের চেয়ে বাংলা সাহিত্যের আন্তর্জাতিকীকরণের জন্য আমাদের সাহিত্যকে অন্যান্য ভাষায় ভাষান্তর করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এসব কর্মকান্ডকে উৎসাহিত করার প্রভাবক হিসেবে বাংলা একাডেমির দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। এখানে আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে, যেমন বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত উত্তরাধিকার পত্রিকাটি ইংরেজি ভার্সনেও প্রকাশ করা যেতে পারে। এছাড়া বিদেশি লেখক, পাঠক এবং গবেষকদের বইমেলায় সহজে আগমনের জন্য সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো এবং অনএড়াইবল ভিসাসহ নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। যাহোক, বাংলা একাডেমিকে অনেক কাজ দেয়া হলো। অবশ্য বইমেলার আন্তর্জাতিকীকরণের দায়িত্ব লেখক ও প্রকাশকদের ক্ষেত্রেও অনেক। প্রকাশক ও লেখকদের প্রকাশনা ও সাহিত্যকর্ম প্রকাশ ও উপস্থাপন এখন আর শুধুই বাংলা মাধ্যমে নয় বরং বহুভাষিক করা উচিত। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলা সাহিত্যের পাঠক বৃদ্ধিসহ গবেষণা ও প্রসারের দিকে দৃষ্টিপাত করা উচিত সবার।
সর্বপরি মুক্তপ্রযুক্তির এই যুগে একুশে বইমেলার আন্তর্জাতিকীকরণ এতোটাই জরুরি যে এটি করতে ব্যর্থ হলে বাংলা সাহিত্যের বিশ্বজয়তো দূরের কথা বরং আগামীর পৃথিবীতে এর আবেদন কমে যাবে আরও। এমনকি বিভিন্ন ধরণের কালচারাল হেজিমনির কাছে আমাদের সাহিত্যের পরাস্ত হবার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে! সুতরাং বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিমনা সকল মানুষের উচিত হবে অমর একুশে বইমেলার আন্তর্জাতিকীকরণ কার্যক্রমে যথাযথ ভূমিকা পালন করা যাতেকরে বিশ্বের দরবারে বাংলা সাহিত্যের একটা শক্তিমান অবস্থান তৈরি হয়।