মঙ্গলবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৯

সান্তাক্লোজের উপহার

সান্তাক্লোজের উপহার


সান্তাক্লোজ, সান্তাক্লোজ
কি এনেছো বলো?
উঠলো হেসে ভালোবেসে
বড়দিনের আলো।

তোমার কাছে একটি চাওয়া
দাও বাঁশি উপহার।
তুলবো সুর সেই বাঁশিতে-
মানুষ ভালোবাসার।।

রবিবার, ৮ ডিসেম্বর, ২০১৯

ব্রেক-আপ'ই শেষ কথা নয়!

আজ, আমায় দিয়েছিস ফাঁকি
আর ভাবছিস, তুই ভীষণ লাকি!

বুঝিসনে বোকা, হিসেব নিকেশ-
ব্রেক-আপেই হয়ে যায় শেষ!
ভালোবাসা বিহীন একলা ঘরে,
কাঁদবি বসে যেদিন!
আমায় ছাড়ার ভুলের হিসেব,
বুঝবি তুই সেদিন!

ব্রেক-আপ'ই শেষ কথা নয়!
মুখটি ডেকে দুটি হাতে,
মাঝেমাঝেই নিজের সাথে-
বহু কথাই হয়!

তুমি বিনে শীত দ্বিগুণ!

তুমি বিনে শীতের তীর- বোধকরি দ্বিগুণ!
প্রথমত, দেহ খুন! দ্বিতীয়ত, মনও খুন!
একলা জীবন, বিরহ যাপনকাল-
বাড়ন্ত শীতের অনন্ত সমকাল।
অথচ,তুমি থাকলে- সুফলা প্রেম। বসন্ত বহুগুণ!

বুধবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০১৯

সুকান্তের কবিতা: পৃথিবী গড়ার আহ্বান-সাকিব জামাল

সুকান্তের কবিতা: পৃথিবী গড়ার আহ্বান


চির তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য । বাংলা সাহিত্যের প্রগতিশীল চেতনার অধিকারী তরুণ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য । তারুণ্যের শক্তি দিয়ে উন্নত শিরে মানুষের মর্যাদার জন্য মানুষকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান সুকান্তের কবিতায় লক্ষণীয়। মানুষের কল্যাণের জন্য সুকান্ত নিরন্তর নিবেদিত থেকেছেন। তিনি মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছেন। তার অগ্নিদীপ্ত সৃষ্টি প্রণোদনা দিয়ে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করতে প্রয়াসী ছিলেন। মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কাব্যধারার প্রচলিত প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিতে পেরেছিলেন।এই আধুনিক যুগে কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য আরো অধিক গবেষণার দাবী রাখে । সুকান্তের কবিতার বিশ্লেষণে আমি বলতে চাই – এই পৃথিবী যতদিন আছে ততদিনই কবি সুকান্তের কবিতার আবেদন থাকবে ।

বৈশ্বিক কবি সুকান্ত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মহৎ সাহিত্যিক হিসেবে প্রায় সব গুণই ধারণ করতেন । কবি সুকান্তের কবিতা বিশ্লেষণে বিষয়টি দিবালোকের মত উন্মোচিত হয় । যাবতীয় শোষণ-বঞ্চনার বিপক্ষে সুকান্তের ছিল দৃঢ় অবস্থান। তিনি তার কবিতার নিপুণ কর্মে দূর করতে চেয়েছেন শ্রেণী বৈষম্য। মানবতার জয়ের জন্য তিনি লড়াকু ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। অসুস্থতা অর্থাভাব তাকে কখনো দমিয়ে দেয়নি। মানুষের কল্যাণের জন্য সুকান্ত নিরন্তর নিবেদিত থেকেছেন। তিনি মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে বিদ্রোহের ডাক দিয়েছেন ।
“একটি কথায় ব্যক্ত চেতনা : আকাশে নীল,
দৃষ্টি সেখানে তাইতো পদধ্বনিতে মিল।
সামনে মৃত্যুকবলিত দ্বার,
থাক অরণ্য, থাক না পাহাড়,
ব্যর্থ নোঙর, নদী হব পার, খুঁটি শিথিল।
আমরা এসেছি মিছিলে, গর্জে ওঠে মিছিল।।-কবিতা :  আমরা এসেছি”

তার কবিতায় অনাচার ও বৈষ্যমের বিরুদ্ধে প্রবল প্রতিবাদ পাঠকদের সংকচিত করে তোলে। গণমানুষের প্রতি গভীর মমতায় প্রকাশ ঘটেছে তাঁর কবিতায়।  অসহায়-নিপীড়িত সর্বহারা মানুষের সুখ, দুঃখ তার কবিতার প্রধান বিষয়। অবহেলিত মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে ধনী মহাজন অত্যাচারী প্রভুদের বিরুদ্ধে নজরুলের মতো সুকান্তও ছিলেন সক্রিয়।
“মহাজন ওরা, আমরা ওদের চিনি!
হে খাতক নির্বোধ,
রক্ত দিয়েই সব ঋণ করো শোধ!
শোনো, পৃথিবীর মানুষেরা শোনো,
শোনো স্বদেশের ভাই,
রক্তের বিনিময় হয় হোক
আমরা ওদের চাই।।   কবিতা : জনতার মুখে ফোটে বিদ্যুৎবাণী ”

সুকান্ত একটি আধুনিক কাব্য ভাষার সৃষ্টি করেছেন। চল্লিশের অন্য কবিদের থেকে তার স্বতন্ত্রতা তিনি গণমানুষের মুক্তি প্রণোদনা সৃষ্টিতে মগ্ন ছিলেন। তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠ সমকাল ও ইতিহাসকে বন্দি করে রেখেছে। দ্রোহের অগ্নিপুরুষ বুকের আগুনে সময়কে তাঁরা আরো শুদ্ধ করে দিয়ে যান। তাই তিনি লেখেন,
‘অবাক পৃথিবী! অবাক করলে তুমি!
জন্মেই দেখি ক্ষুব্ধ স্বদেশভূমি।

…বিদ্রোহ আজ বিদ্রোহ চারিদিকে
আমি যাই তারি দিন-পঞ্জিকা লিখে,’… কবিতা-অনুভব ।

সুকান্তের কবিতা সব ধরনের বাধা-বিপত্তিকে জয় করতে শেখায় । যাপিত জীবনের দুঃখ-যন্ত্রণাকে মোকাবিলা করার সাহস তাঁর কবিতা থেকে পাওয়া যায়। তারুণ্যের শক্তি দিয়ে উন্নত শিরে মানুষের মর্যাদার জন্য মানুষকে প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান সুকান্তের কবিতায় লক্ষণীয়। সুকান্তের কবিতা সাহসী করে, উদ্দীপ্ত করে।
“আঠারো বছর বয়সের নেই ভয়
পদাঘাতে চায় ভাঙতে পাথর বাধা,
এ বয়সে কেউ মাথা নোয়াবার নয়-
আঠারো বছর বয়স জানে না কাঁদা। কবিতা : আঠারো বছর বয়স”

অভিনবত্বের চেয়েও প্রকাশ ভঙ্গির বলিষ্ঠতা এবং প্রতিমা নির্মাণের অভিনবত্বের জন্য পাঠক সমাজে অকুণ্ঠ প্রশংসা পেয়েছে | উচ্চতর মানবিক চেতনায় উজ্জীবিত কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য সুন্দর, মানবতার, অধিকার ও সমতার পৃথিবীর স্বপ্নে বিভোর ছিলেন । তার অনেক কবিতায় পৃথিবীকে সাজানোর প্রত্যয় এবং প্রয়াস লক্ষণীয় ।

“এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান;
জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপ-পিঠে
চলে যেতে হবে আমাদের।
চলে যাব- তবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ
প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,
এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য ক’রে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।- কবিতা :   ছাড়পত্র”

বাংলা সাহিত্যে তার এই বৈশ্বিক ভাবনা সকল সংকীর্ণতার উর্ধ্বে । অনেকটা বিশ্বনেতার মত স্বপ্ন কাতুরে । তার কবিতার মত সুন্দর হোক এই পৃথিবী একজন পাঠক হিসেবে এই প্রত্যাশা নিয়ে বেঁচে আছি ।

স্বাধীনতার কবি শামসুর রাহমান-- সাকিব জামাল

স্বাধীনতার কবি শামসুর রাহমান


'স্বাধীনতার কবি' এই বিশেষণটি জড়িয়ে আছেন যিনি, তিনি আমাদের সবার প্রিয়জন কবি শামসুর রাহমান। স্বাধীনতার কবিতা নিয়ে যেকোন ধরনের আলোচনা বা অনুষ্ঠানে মনেপড়ে যায় যেসব কবির কবিতা- তাদের মধ্যে অগ্রগণ্য তিনিই। "স্বাধীনতা তুমি" কবিতা প্রায় সব বাঙালির অন্তরে ভীষণভাবে গ্রথিত হয়ে রয়েছে যা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্বাধীনতাপূর্ব থেকে স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনি অসংখ্য স্বাধীনতার কবিতা, দেশের কবিতা লিখেছেন। এই বিশেষ মাত্রাটি বহুমাত্রিক এই কবির স্বাধীনতার কবি হিসেবে পরিচয়টি মূখ্য করে তুলেছে। আমাদের মত নতুন প্রজন্মও স্বাধীনতার কবি হিসেবে তাকেই চিনেছি। তার কবিতায় স্বধীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে ফুল বাগানের নানা ফুলের সমারোহে সাজানো কুসুমকুঞ্জরূপে- যার সৌরভ বাংলা সাহিত্যের পাঠকমহল পাঠক আজও অনুভব করে।  সেই বৈচিত্র্যময় ফুলবন একটু ঘুরে  দেখা যাক।

স্বাধীনতার জন্য আকুতি তার কবিতার অন্যতম উপজীব্য বিষয়। আমরা ছোটবেলায় পড়েছি-  রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতাংশ "স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়?" সম্ভাবত কেউই চায় না! সেই স্বাধীনতা অর্জন কিন্তু সহজ নয়। কবি শামসুর রাহমানের “তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা” কবিতায় স্বাধীনতার আকুতির ভীষণ পরিনতি লক্ষ্য করা যায়। যেমন এই কবিতাংশ-
“তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো
দানবের মত চিৎকার করতে করতে
তুমি আসবে ব’লে, হে স্বাধীনতা,
ছাত্রাবাস বস্তি উজাড় হলো। রিকয়েললেস রাইফেল
আর মেশিনগান খই ফোটালো যত্রতত্র।
তুমি আসবে ব’লে, ছাই হলো গ্রামের পর গ্রাম।" এমন ভয়ঙ্কর অবস্থার কথা জেনেও কবি তবু স্বাধীনতাকেই চেয়েছে, বলেছেন-
“এই বাংলায়
তোমাকেই আসতে হবে, হে স্বাধীনতা।“

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করেছেন কলম দিয়ে। একাত্তরের অবরুদ্ধ বাংলাদেশ তথা বন্দিশিবির থেকে লিখেছেন কালজয়ী কবিতা। সেই কবিতা ছিল মুক্তিযুদ্ধের অনুপ্রেরণা, স্বাধীনতার আকুতি ভরা। যেমন-
"স্বাধীনতা শব্দ এত প্রিয় যে আমার
কখনো জানিনি আগে। উঁচিয়ে বন্দুক,
স্বাধীনতা, বাংলাদেশ- এই মতো শব্দ থেকে ওরা
আমাকে বিচ্ছিন্ন করে রাখছে সর্বদা।"(কবিতা:বন্দী শিবির থেকে)  

উল্লেখ্য,২১ জুলাই ১৯৭১ তারিখে কবিতাটি ভারতীয় ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ছদ্মনামে। মজলুম আদিব, যার অর্থ নির্যাতিত কবি। বন্দী শিবির থেকে এ কাব্যগ্রন্থটিতে স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের স্মরণ, স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন আবেগ ও প্রত্যাশা প্রাধান্য পেয়েছে। যাহোক, বাঙলি জাতির মনে স্বাধীনতা অর্জনের বাসনা জাগ্রত করেছেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে প্রেরণা দিয়েয়েছেন- স্বাধীনতার কবি শামসুর রাহমান।

স্বাধীনতার স্বরূপ উন্মোচনে বিচিত্রতায় ভরপুর তার কবিতা। স্বাধীনতাকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন কবি। কখনো প্রকৃতি, কখনো প্রম, কখনো দ্রোহ, কখনো সাহিত্যরূপে দেখিয়েছেন স্বাধীনতাকে। “স্বাধীনতা তুমি” কবিতাটি যার উজ্জ্বল প্রমাণ। যেমন-
"স্বাধীনতা তুমি
বাগানের ঘর, কোকিলের গান,
বয়েসী বটের ঝিলিমিলি পাতা,
যেমন ইচ্ছে লেখার আমার কবিতার খাতা।"এছাড়া স্বাধীনতার পতাকা মানবিকও বটে। আসাদের শার্ট কবিতায় কবি সে কথাও বলেছেন।
"আমাদের দুর্বলতা, ভীরুতা কলুষ আর লজ্জা
সমস্ত দিয়েছে ঢেকে একখন্ড বস্ত্র মানবিক;
আসাদের শার্ট আজ আমাদের প্রাণের পতাকা।"
এভাবে নানা চিত্রে, নানা উপমায় স্বাধীনতাকে উপস্থাপন করেছেন কবি শামসুর রাহমান।

স্বাধীনতা অর্জনের পরে তা রক্ষা এবং দেশপ্রেম জাগ্রত রেখে চেতনাসমৃদ্ধ করার আহ্বান আছে তার কবিতায়। “যাত্রা থামাবো না” কবিতায় কবি শামসুর রাহমান বলেছেন-
"এগিয়ে যেতেই চাই। স্থবির আমার চতুর্দিকে
গজিয়ে উঠুক নিত্য দীর্ঘকায়  ঘাস।"

কী দারুন স্বপ্নিক চিন্তা! কিন্তু সে  স্বাধীন দেশে যখন নির্যাতন, নিপীড়ন, রাজনৈতিক সমস্যা দেখা দেয় সে প্রসঙ্গে  তিনি লিখেন- “উদ্ভট উটের পিঠে চলছে স্বদেশ” কবিতাসহ বেশ কিছু কবিতা তুলে ধরেন দেশ ও সমাজের অসংগতি। এভাবে স্বাধীনতার চেতার নিরিখে দেশ গড়ার আহ্বান তার কবিতায় ভাস্বর হয়ে ওঠে।

পরিশেষে বলা যায়, স্বাধীনতার তীব্র আকাক্ষা ও প্রত্যাশা, সংগ্রামী প্রবণতা এবং মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমের চেতনায় শামসুর রাহমানের কাব্যজগৎ হয়ে উঠেছিল স্বাধীনতার পঙতিমালায় ঐশ্বর্যমন্ডিত। সুতরাং, স্বাধীনতা এবং দেশত্ববোধ নিয়ে বহুমাত্রিক ভবনার কারনে দীর্ঘকালীন সময়ের দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবেন 'স্বাধীনতার কবি' কবি শামসুর রাহমান।